শিলিগুড়ির সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সরকারি দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার উপস্থিতিতে আয়োজিত এই বৈঠকে মূলত জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ও একাধিক নাগরিক সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। দীর্ঘ দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠকে সাংসদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিধায়ক আনন্দময় বর্মন, ফাঁসিদেওয়ার বিধায়ক দুর্গা মুর্মু, দার্জিলিংয়ের বিধায়ক নোম্যান রাই, কার্শিয়াংয়ের বিধায়ক সোনম লামা। এছাড়া জেলাশাসকএবং বিভিন্ন দফতরের পদস্থ কর্তারাও এই বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সাংসদ রাজু বিস্তা স্পষ্ট ভাষায় জানান, রাজ্য সরকারের বার্ষিক বিপুল বাজেট সত্ত্বেও তা সঠিক রূপায়নের অভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তিনি বলেন, "মোদীজি এবং শুভেন্দু অধিকারির এই সরকার সাধারণ মানুষের সরকার। প্রশাসনিক আধিকারিকদের জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকার ও জনগণের মাঝখান থেকে টাকা গায়েব হয়ে যাওয়ার যে ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেম রয়েছে, তা এবার বন্ধ করতে হবে।"
বৈঠকে বিধায়কেরা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা ও চাহিদার কথা প্রশাসনের সামনে তুলে ধরেন। সাংসদ জানান, সাধারণ মানুষের চাহিদা খুবই সীমিত ও স্পষ্ট। প্রতিটি এলাকায় উন্নত রাস্তাঘাট এবং পরিশ্রুত পানীয় জলের দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামো এমন হতে হবে যাতে দরিদ্র মানুষ কম খরচে ওষুধ ও সঠিক চিকিৎসা পান। কর্পোরেশন, মিউনিসিপ্যালিটি বা জিটিএ (GTA) এলাকা সর্বত্রই স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও উন্নত পঠনপাঠনের পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক। শিলিগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের নিত্যদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং শহর ও গ্রামীণ এলাকায় নিয়মিত সাফাই অভিযান চালাতে হবে।
পাশাপাশি বেআইনি খনন, ড্রাগস ও 'গুন্ডা ট্যাক্স' বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। উত্তরবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা ও পরিবেশ রক্ষা নিয়ে এই বৈঠকে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নেন জনপ্রতিনিধিরা। পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকাগুলো পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল, সেখানে কোনোভাবেই বেআইনি নদী খনন বরদাস্ত করা হবে না। এর ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ডুবছে। আসাম, কোচবিহার হয়ে নিউ জলপাইগুড়ি বা বাগডোগরা ও মাটিগাড়ার বিভিন্ন এলাকায় যে আন্তর্জাতিক ড্রাগস ও গাঁজা পাচারের চক্র সক্রিয় রয়েছে, তা সম্পূর্ণ নির্মূল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই চক্রের মূল পান্ডাদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান সাংসদ। শহরের ফুটপাথ বা ঠেলাগাড়ি চালকদের কাছ থেকে রাজনৈতিক দল বা দালালদের দৈনিক তোলা আদায় (গুন্ডা ট্যাক্স) অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এছাড়াও তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে শিলিগুড়িকে একটি পৃথক প্রশাসনিক জেলা হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানান, যাতে সাধারণ মানুষকে ছোটখাটো কাজের জন্য পাহাড়ে ছুটতে না হয় এবং জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলার সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার অবসান ঘটে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের দালাল চক্র এবং রোগীদের অনাবশ্যক কলকাতায় 'রেফার' করার প্রবণতা রুখতে কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। চা বাগানের উদ্বৃত্ত জমি বহিরাগতদের লিজ দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে সাংসদ জানান, এই জমির ওপর প্রথম অধিকার চা শ্রমিকদের। এছাড়া ফুলবাড়ি টোল প্লাজায় স্থানীয়দের ওপর জুলুম বন্ধ করা এবং 'অমৃত' প্রকল্পের মাধ্যমে শিলিগুড়ির ঘরে ঘরে দ্রুত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রশাসনকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শেষে ভুয়ো নথি তৈরি করে বনের ও সরকারি জমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা। তিনি সাফ জানান, "শিলিগুড়ি ও সংলগ্ন অঞ্চলে বার্থ, ডেথ বা কাস্ট সার্টিফিকেট দেওয়ার নামে কোনো টাকা নেওয়া চলবে না। এনজিপি স্টেশন, উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও বাগডোগরা এয়ারপোর্ট চত্বরকে সম্পূর্ণ সিন্ডিকেট-মুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।" একই সঙ্গে শিলিগুড়ির বহু বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স না থাকা এবং ওষুধের নামে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টিকে 'বেআইনি ও অবৈধ আখ্যা দিয়ে সিএমওএইচ-কে কড়া পদক্ষেপের নির্দেশ দেন তিনি। কয়লা, সুপারি ও গুটখা চোরাচালানের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি রোখার পাশাপাশি, গত ৫ বছরে জিটিএ ও পুরনিগমের সমস্ত কাজের অডিট বা পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সাংসদ।
#WestBengal
#District
#devlopment
#MLA
#hills